আসাম থেকে ২ হাজার জনকে পুশব্যাক: বিশ্বশর্মা বিশেষজ্ঞদের মতামত: ৭৫ বছর আগের আইনে এটা করা যায় না
নতুন পয়গাম, গুয়াহাটি: উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেছেন, ১৯৫০ সালের এক আইন ব্যবহার করে গত কয়েক মাসে প্রায় দুই হাজার জনকে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছে। আসামের ট্রাইব্যুনাল কাউকে ‘বিদেশি’ বলে চিহ্নিত করার এক সপ্তাহের মধ্যেই তাকে ‘পুশব্যাক’ করা হবে বলেও জানান তিনি। উচ্চতর আদালতে আপিল করে যাতে সেই ‘বিদেশি’ কালক্ষেপ না করতে পারে, সেজন্যই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। নতুন বছরের শুরুতে আসাম মন্ত্রিসভার নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত জানাতে সা্ংবাদিক সম্মেলনে শুক্রবার তিনি এসব কথা বলেন।
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা প্রশ্ন তুলছেন, ১৯৫০ সালের আইনটি ৭৫ বছর পরে ব্যবহার করার আইনি বৈধতা আছে কিনা? তারা বলছেন, ওই আইনটি ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে হয়েছিল, এখন তা প্রয়োগ করা যায় না। ওই আইনটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার কথাও ভাবা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গৌহাটি হাইকোর্টের এক সিনিয়র আইনজীবী।
হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, অভিবাসী (আসাম থেকে বহিষ্কার) নির্দেশ, ১৯৫০-এর বিধি মেনে গত কয়েক মাসে প্রায় দুই হাজার মানুষকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ জনকে ৩১ ডিসেম্বর পাঠানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, কোনো ব্যক্তিকে ট্রাইব্যুনাল ‘অবৈধ বিদেশি’ বলে চিহ্নিত করার এক সপ্তাহের মধ্যে সীমান্ত দিয়ে পুশব্যাক করা হবে, যাতে হাইকোর্ট আর সুপ্রিম কোর্টে তারা আপিল করতে না পারে। এর ফলে অবৈধ পথে আসামে আসা বিদেশিদের সংখ্যা কমবে বলে তার দাবি।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ চিহ্নিত করার পরে কীভাবে তাদের তাড়ানো হবে, এ নিয়ে আগে কোনো গাইডলাইন ছিল না। ঘোষিত বিদেশিদের ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হত, কিন্তু তারা অনেকেই জামিনে বেরিয়ে যেত। আমরা কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তির কথা বলছি না, আমাদের প্রয়োজন নেই। শুধু পুশব্যাকই বিদেশিদের মোকাবিলা করার নতুন উপায়।
১) দেশভাগের পরে অভিবাসনের জন্য একটি জরুরি ব্যবস্থা হিসাবে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। কখনই নিয়মিত বিতাড়ণের স্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে না এটি।
২) ১৯৫০ সালের আইনটি এখন প্রয়োগের আইনি বৈধতা আছে কিনা? আইনটি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল, এখন তা প্রয়োগ করা যায় না।
৩) আইনটি পাকিস্তান আমলে তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল তার দুই দশক পর ১৯৭১ সালে। আইনটিতে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের কথাই উল্লেখ আছে।
এই আইনটি তৈরি হয়েছিল ১৯৫০ সালের ১ মার্চ। অর্থাৎ আইনটি ‘বাংলাদেশ’ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার অনেককাল আগেই পাকিস্তান আমলে তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল তার দুই দশক পর ১৯৭১ সালে। আইনটার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অভিবাসী (আসাম থেকে বহিষ্কার) নির্দেশ-১৯৫০’। আসাম থেকে বহিষ্কারের কথা বলা হলেও এই নির্দেশ পুরো ভারতেই জারি করা যাবে বলে লেখা আছে আইনটিতে।
দেশের বাইরের কোনো জায়গার নাগরিক যদি নির্দেশটি জারি হওয়ার আগে বা পরে আসামে এসে থাকে এবং সেই ব্যক্তির আসামে বসবাস যদি ভারতের সাধারণ নাগরিকদের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তাহলে ভারত সরকারের কোনো অফিসার সেই ব্যক্তিকে নিজে থেকেই চলে যেতে বলতে পারেন, অথবা তাকে ভারত থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে।
কোন তারিখের মধ্যে এবং কোন পথ দিয়ে ফেরত যেতে হবে, সেটাও নির্দিষ্ট করে দিতে হবে বহিষ্কারের নির্দেশে, একথা লেখা আছে আইনটিতে। ওই নির্দেশটি পাকিস্তানের আমলের, তাই সেখানে এও লেখা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি পাকিস্তানের সেইসব এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসামে এসে থাকেন, যে এলাকায় অশান্তি হচ্ছে, বা অশান্তি হওয়ার আশঙ্কা আছে, তার ক্ষেত্রে এই নির্দেশ বলবৎ হবে না।
কেন্দ্রীয় সরকার বা আসাম মেঘালয় ও নাগাল্যান্ডের কোনো সরকারি অফিসার ওই নির্দেশ কার্যকর করতে পারবেন বলেও লেখা আছে আইনটিতে। পঁচাত্তর বছর আগের আইন ব্যবহার নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। আইনজীবীরা বলছেন, ১৯৫০ সালের আইনটি এখন ব্যবহার করাটা অবৈধ, কারণ ওই আইনটি একটি বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হয়েছিল। এতকাল পর এখন আইনটি পদ্ধতিগতভাবে অসাংবিধানিক।
গোহাটি হাইকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক ভুঁইয়া বলেন, ১৯৫০ সালের আইনটি এখন কেন ব্যবহার করা অসাংবিধানিক বলছি, তার অনেকগুলি কারণ আছে। আইনটির উদ্দেশ্য এবং কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখা আছে যে, দেশভাগের পরে অভিবাসনের জন্য একটি জরুরি ব্যবস্থা হিসাবে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। কখনই নিয়মিত বিতাড়ণের স্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে না এটি। আইনটির দু-নম্বর ধারায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সন্তুষ্টির কথা বলা হয়েছে – কোনো নোটিশ দেওয়া হবে না, শুনানি হবে না, বা আপিলও করা যাবে না। সংবিধানের ১৪ এবং ২১ নম্বর ধারার লঙ্ঘন এটা।
তিনি এও বলেন, বিদেশি আইন, নাগরিকত্ব আইন বা পাসপোর্ট আইনের পরিবর্তে কখনই হতে পারে না ১৯৫০ সালের আইনটি। তাঁর দাবি, ১৯৫০ সালের ওই অভিবাসন আইনটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। বর্তমান যুগের আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওই পুরোনো আইনটি খাপ খায় না। গুয়াহাটি হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হাফিজ রশিদ চৌধুরী বলেন, যে পুরোনো আইনটি ব্যবহার করার কথা বলা হচ্ছে, তা দিয়ে পুশব্যাক করায় যায় না। ট্রাইব্যুনালকে এড়িয়ে এক্সিকিউটিভ অর্ডার দিয়ে এখান থেকে পুশ ব্যাক করার চেষ্টা করা হচ্ছে। শুধু যে বিদেশি ট্রাইব্যুনালকে এড়ানোর কথা ভাবা হচ্ছে, তা নয়। ট্রাইব্যুনালের আদেশের পরে তো কেউ হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টেও যেতে পারেন, আপিল করতে পারেন। এক্ষেত্রে পুরো বিচার ব্যবস্থাকেই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা অসাংবিধানিক।
মানবাধিকার সংগঠন ‘সিটিজেন্স ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস’ বা সিজেপি-র আসাম রাজ্য ইনচার্জ পারিজাত নন্দ ঘোষ বলেন, যে প্রায় দুই হাজার মানুষকে পুশব্যাক করা হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করলেন, তাদের তালিকা কোথায়? এদের মধ্যে যে কোন ভারতীয় নাগরিক নেই, সেই নিশ্চয়তা কোথায়? এর আগেও তো আমরা দেখেছি, রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া মানুষদের অনেককে আবার আদালতের রায়ে বাধ্য হয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে – অর্থাৎ তারা প্রকৃতই ভারতের নাগরিক ছিলেন! সুতরাং হিমন্ত বিশ্বশর্মা সরকার আসন্ন বিধানসভা ভোটের আগে এভাবে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী নায়ক সাজতে চাইছেন বলে তাদের অভিমত।








